About

.

গর্ভকালীন স্বাস্থ্য সমস্যা ও কি করণীয়

গর্ভধারণ ব্যাপারটা প্রত্যেক মহিলার জন্য আনন্দের। কিন্তু আনন্দের পাশাপাশি প্রত্যেক ‘মা’ কেই পুরো গর্ভাবস্থায় কিছু ছোট খাটো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কোন সমস্যা ছাড়া পুরো গর্ভাবস্থা শেষ করেছেন এমন ‘মা’ খুব কমই পাওয়া যাবে। গর্ভাবস্থা একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। একটা শিশু যেমন শৈশব, যৌবন পার হয়ে পূণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয় তেমনি গর্ভাবস্থায় ছোট্ট ভ্রুণ ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ মানবশিশুতে রূপান-রিত হবে এটাও স্বাভাবিক।

গর্ভকালীন কিছু সমস্যা

০ বমিভাব ও বমি : এটা খুব সাধারণ সমস্যা এবং বলা হয়ে যে, এটা গর্ভধারণের প্রথম লক্ষণ। কি কারণে বমি হয় তার সঠিক কারণ জানা যায়নি, তবে গর্ভাবস্থায় কিছু হরমোনের উপস্থিতির জন্য এটা হয়। বমি বমি ভাব তিন-চার মাস পর্যন- থাকে ও পরে আসে- আসে- চলে যায়। কোন কারণ ছাড়া এমনকি কোন কিছু গন্ধ নাকে আসলেও বমি হতে পারে। সকালে উঠে খালি পেটে শুকনো টোস্ট খেলে এবং ক্ষিধে লাগার আগেই খেয়ে ফেললে বমির ভাব কম হয়। সাধারণ বমি ডাক্তারের পরামর্শ মতে কিছু ওষুধ খেলে সেরে যায় বা কমে যায়। কিন্তু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বমি হয় তখন চিকিৎসকের নির্দেশমত চিকিৎসা ও প্রয়োজনে হাসপাতালেও ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

০ তলপেটে ব্যথা : জরায়ু ধীরে ধীরে বড় হয়ে এর আশে-পাশের লিগামেন্টে টান পড়ার জন্য তলপেটে ও কুঁচকিতে হালকা ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা স্বাভাবিক। এই ব্যথা পাঁচ-ছয় মাসের দিকে হয়।

০ পিঠে ও কোমড়ে ব্যথা : গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এধরনের ব্যথা হয়। হরমোনের কারণে হাড়ের জোড়াগুলো শিথিল হওয়ার জন্য এই ব্যথা হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে, সঠিক নিয়মে উঠা-বসা করলে ও শুলে এই ব্যথা কমে যায়। এই ব্যথার জন্য সাধারণ কোন ব্যথা নাশক ওষুধ দেয়া হয় না তবে বেশী ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতে ওষুধ খেতে হবে।

০ সাদা শ্রাব : গর্ভাবস্থায় হরমোন ইস্ট্রোজেন ও রক্ত সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার জন্য সাদা শ্রাব কোন কোন সময় যেতে পারে। ঢিলেঢালা পোষাক ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। সাদা শ্রাবের সাথে যদি দুর্গন্ধ থাকে বা চুলকানি হয় তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

০ গলা ও বুক জ্বালা : এটাও গর্ভকালীন একটা সাধারণ সমস্যা। অতিরিক্ত ঝাঁল, তেলচর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিলে এসমস্যা কমে যায়। তবে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে শুয়ে থাকলে বড় জরায়ু পাকস্থলীতে চাপ দেয়ার জন্য এটা হতে পারে। তখন উচুঁ বালিশে কাত হয়ে শোয়া, খাবার পর কিছুক্ষণ হাঁটা-হাঁটি করার পর পানি খেলে এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

০ পায়ে পানি আসা : গর্ভাবস্থার শেষের দিকে পায়ে কিছু পানি আসতে পারে। তবে অতিরিক্ত পা ফোলা বা পা ফোলার সাথে প্রেসার বেশী থাকলে প্রি-একলামসিয়া চিন-া করা হয়, তখন ডাক্তারের পরামর্শ মতে চিকিৎসা নিতে হবে।

উপরোক্ত এসব সাধারণ সমস্যা ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা বিশেষ করে প্রথমদিকে মাথাঘোরা, অরুচি, দুর্বল লাগা, আলসেমি লাগা-শেষের দিকে ওঠতে বসতে বা শোয়া থেকে উঠতে কষ্ট লাগা, হাত-পা গরম ভাব, গায়ে মুখে বিশেষ করে গলায় কালো দাগ পড়া, পেঁটের চামড়া ফেটে যাওয়া বেশী পিপাসা লাগা বা ক্ষিধে পাওয়া এগুলো হতে পারে।

গর্ভাবস্থা একটা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। ভ্রুণ ধীরে ধীরে বাড়ার সাথে সাথে মায়ের শরীরে কিছু পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তন স্বাভাবিক। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এসবের জন্য কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তবে গর্ভবতী মা নিজে সব সময় কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা অস্বাভাবিক সেটা নাও বুঝতে পারেন। অনেক সময় অসুখের কারণেও সাধারণ সমস্যা একটু অসাধারণ ভাবে দেখা দিতে পারে। সেজন্য গর্ভাবস্থায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতে এবং নির্দেশ মত চলতে হবে।

ডা: আইরিন পারভীন আলম
প্রসূতী ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
চেম্বার: সালাউদ্দিন স্পেশালাইজ্‌ড হাসপাতাল
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক,

মনের উপরে জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব

গত কয়েক মাসে পৃথিবীতে যে বিষয়টি সম্ভবত সবচেয়ে বেশিবার আলোচিত হয়েছে, তা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে আছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের নামটিও আলোচনায় এসেছে বহুবার। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার প্রভাবে ভৌগোলিক যে পরিবর্তন হবে, বা এর ফলে শারীরিক যা যা সমস্যা হতে পারে, তা নিয়ে বলা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু যে বিষয়টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে খুব বেশি আলোচিত হয়নি, তা হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের কথা ও মানসিক সমস্যার কথা।
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক—বছর বছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় তো আছেই; পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব এ দেশের ওপর পড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তার ওপর দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি অবস্থান করায় এবং সুসংহত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে সব সময় এ দেশের মানুষ এক ধরনের মনঃসামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে। মানসিক সমস্যা হওয়ার এত উপকরণ থাকায় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা একটু বেশি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী মানসিক রোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ তা দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাস্থ্য সমস্যা (প্রথম হবে হূদরোগ) হিসেবে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশও এ আশঙ্কার বাইরে নয়।
বৈরী প্রকৃতির কারণে অতি উদ্বিগ্নতা, খিটখিটে মেজাজ, তীব্র মানসিক চাপ (একিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার), মানিয়ে চলার সমস্যা (অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার), আবেগের সমস্যা, বিষণ্নতা থেকে শুরু করে গুরুতর মানসিক রোগ (সাইকোসিস) ও বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত রোগ (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।
শত কোটি বছরের বৃদ্ধ সূর্যের নিচে পুড়তে পুড়তে পৃথিবী প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে তার জৌলুশ আর সেই সঙ্গে মানবসৃষ্ট ‘উন্নয়নপ্রবণ’ আবর্জনার জঞ্জালে পৃথিবীর নাভিশ্বাস হওয়ার জোগাড়। জলবায়ু পরিবর্তন আর দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মানুষের দুর্যোগ-পরবর্তী মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়াও পরিবর্তিত হয়েছে বারবার।
জলবায়ু পরিবর্তনের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মানুষ হয়ে যেতে পারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, আতঙ্কিত বা উৎকণ্ঠিত। হঠাৎ যদি বন্যা বা খরার কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে তীব্র মানসিক চাপ বা একিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। এ সমস্যা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উদ্দীপনায় সাড়া না দেওয়া, অথবা হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করে ফেলতে পারে যে কেউ।
জলবায়ুর পরিবর্তন থেকে হতে পারে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সেই দুর্যোগের কারণে সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এই ক্ষতির আশঙ্কা থেকেও তীব্র উৎকণ্ঠা বা অহেতুক ভীতির উদ্রেক হতে পারে; আর এমন ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকতে থাকতে তৈরি হতে পারে বিষণ্নতা। আর দুর্যোগ যদি হয়েই যায়, তবে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। বিষণ্নতার সাধারণ উপসর্গ হচ্ছে বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকা, কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলা, চারদিকের জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলা, অবসাদে ভোগা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা হওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা ও চেষ্টা করা।
আবার জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। অবস্থাপন্ন একজন কৃষক হতে পারেন সর্বস্বান্ত, কিংবা পরিবর্তন করতে পারেন নিজের পেশা বা গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসিত হয়ে যেতে পারেন। সব ক্ষেত্রেই তার মানিয়ে চলার সমস্যা বা অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘দুর্যোগ-পরবর্তী মনঃসামাজিক পরিচর্যা’ শীর্ষক একটি প্রকাশনায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ, হতাশা ইত্যাদি কারণে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকাংশে বেড়ে যেতে পারে।
আর আঘাত-পরবর্তী মানসিক সমস্যা বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো তীব্র মানসিক চাপজনিত সমস্যার মতো হলেও শুরুটা হয় দুর্যোগের অনেক পরে, আর স্থায়িত্বও হয় অনেক দীর্ঘ। এ সমস্যায় দুর্যোগের স্মৃতি বারবার মনে পড়া, দুর্যোগসংশ্লিষ্ট উদ্দীপককে এড়িয়ে চলা, অতিমাত্রায় সজাগ থাকা, খিটখিটে হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ থাকতে পারে।
আর যারা আগে থেকেই কোনো মানসিক রোগে ভুগছে, দুর্যোগের কারণে তাদের মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
আবার জলবায়ু পরিবর্তন বা দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কোনো প্রকৃত শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই মানসিক সমস্যার কারণে শারীরিক উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসতে পারে। সেখানে দেখা যায়, মানসিক কারণে তাদের মধ্যে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, বুক ধড়ফড়, খাদ্যে অরুচি, শরীর ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ রোগকে বলা হয় সাইকোসোমাটিক ডিসঅর্ডার। এ সময় মানসিক রোগ চিকিৎসকের সহায়তায় চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শরীরের মধ্যে নানা পরিবর্তন হয়, বিশেষত মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর তারতম্য হয়, মনের মধ্যে ঘটে যায় নানা আবেগের টানাপোড়েন। এতে পরিবর্তিত পরিবেশ আর সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খায় মানুষ। ফলে ঘটতে পারে নানা মানসিক বিপর্যয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রায় শীর্ষে, তার ওপর নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত তো রয়েছেই।
তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার যে নীতি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো নিয়েছে, সে নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। জরুরি মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ারও।

আহমেদ হেলাল
জলবায়ু পরিবর্তন ও মনের আবহাওয়া মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো,

দিনের সব সময় কর্মক্ষম থাকুন

দিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকা যাদের অভ্যাস এদের হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি খুব বেশি। হার্ট এ্যাটাকের পেছনে এমন অনেক উপাদান আছে যা বদলানো যায় না, যেমন-বয়স, জেন্ডার, গোত্র, হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস। তবে বেশিরভাগ সময় বসে থাকা যাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের অংশ, অর্থাৎ যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেনইনা-এ এমন এক ঝুঁকি যাকে সামলানো যায় সহজেই। আর নিয়মিত ব্যায়াম করলে এর সুফল পড়ে অন্যান্য ঝুঁকির উপর। যেমন-মনের চাপ, স্থলতা, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোলেস্টেরলের উচু মান এবং ডায়াবেটিস জীবনকে চলমান রাখার, নড়ে চড়ে উঠার আরও অনেক সুফল আছে।

বসে দিন কাটানোর অভ্যাস বদলানো যায় না?

নিউইউর্ক সিটির মন্টেফায়োরে মেডিকেল সেন্টারে ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের প্রফেসর বরার্ট ওস্টাফিল্ড বলেন, ‘নিজের জীবন যাপনের প্রভু তো নিজেই।’ ডা: ওস্টফিল্ড জোর দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস- হলে, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করলে, সুষম খাবার খেলে বড় রকমের পরিবর্তন আনা যায় জীবনে। ‘দিনে বসে থাকার যে জীবন-এ হলো হৃদ স্বাস্থ্যর জন্য বড় বিপর্যয়-সর্বোপরি সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্যই। আমাদেরকে সক্রিয় হতে হবে, ডেস্কে বসে বসে বা সোফায় সারাদিন বসে দিন কাটানোর জন্য জীবন নয়।’

ডাক্তারকে দেখান এবং সচল হন, চলমান হন। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের বিশ্লেষকরা হৃদস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য হৃদস্বাস্থ্যকর ব্যায়ামের একটি কর্মসূচী বাতলে দিয়েছেন। এর মূল কথা হলো সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনে ৩০-৬০ মিনিটের মাঝারি ধরনের শরীরর্চ্চা। তবে যে কোনও ব্যায়ামের কর্মসূচী শুরু করার আগে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো -

০ যদি হয় মধ্য বয়স বা এর বেশি বয়স

০ সমিতি নিষ্ক্রিয় জীবন

০ শরীরের ওজন বেশি

০ হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে

০ অন্য কোনও রোগ রয়েছে সক্রিয় থাকার উপায়, ডাক্তার বলে দিলেন, এবার শুরু হোক শরীরের চর্চা।

১. প্রথমে গা গরম এরপর শীতল হওয়া: প্রথমে হাত পা একটু ছোড়াছুড়ি করে, স্ট্রেচিং করে গা গরম করা, এতে হাড়ের গিটের নমনীয়তা বাড়বে, বাড়বে পেশির নমনীয়তা। পা, পিঠ, কোমর স্ট্রেচ কর এবং এরপর পাঁচ মিনিট হাটা। এরপর ব্যায়ামের পর্ব শেষ করে এরকম হালকা স্ট্রেচিং করে শীতল হওয়া।

২. হার্টের স্পন্দন হার যেন বাড়ে: হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর ব্যায়াম প্রয়োজন। তাই করা চাই এরোবিক ব্যায়াম। দ্রুতহাটা, জগিং, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, গলফ খেলা। সপ্তাহের প্রতিদিন ৩০ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট।

৩. দেহে হোক শক্তি বৃদ্ধি: স্ট্রেংথ ট্রেনিং যেমন ভার উত্তোলন, ইয়োগাব্যায়াম, পুশআপ, বৈঠক, ডাম্ববেল ভাজা এমনকি মনোহারী দোকানের বাজার থলিতে করে বাসায় নেয়া, সিড়ি বেয়ে উঠা, লন্ডির কাপড় তুলে নিয়ে হাটা-এসব করলে শরীরের সার্বিক বলশক্তি, ভারসাম্য, সমন্বয় ও পেশিটোল বাড়বে।

৪. কাজের ফাঁকে ফাঁকে শরীর চর্চা: কাজের ফাঁকে ফাঁকে বা অলস অবসর সময়ে করা যায় উঠ-বস, আসন পিডি হয়ে বসা, হাতের গুল ফুলানো-এসব করা যায় টিভি দেখতে দেখতে। ফোন করার সময় হাটা, উঠ বস, বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা। গাড়ি দূরে পার্ক করে হেটে অফিসে যাওয়া বা বাড়িতে আসা। প্রতিদিনের হাটার সময় পেডোমিটার পরে নেওয়া।

৫. এসব লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হওয়া: জিমে যোগ দিতে পারেন, ফিটন্যাস প্রোগ্রামে, বন্দুদের সঙ্গে একত্রে শরীরচর্চা আরও প্রনোদিত করবে এসব কাজে। ‘ব্যায়াম হলো প্রকৃত যৌবন ঝর্ণা।’ বলেন ওস্টফিল্ড’ হাটা উপবোগ করলে, হাটুন। টেনিস খেলতে পছন্দ, টেনিস খেলুন। কেন নয় ওয়াটার পলো? যে শরীর চর্চা উপভোগ্য মনে হবে তা করলেই ভালো হবে। ব্যায়াম না করার চেয়ে যে কোন ব্যায়ামই শ্রেয়।

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক,

সুস্থ সবল হার্ট চাইলে কি করতে হবে

বর্তমান সময়ে হৃদরোগ শুধু উন্নত বিশ্বেই নয়, বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও ভয়াবহরূপে বিস্তার লাভ করছে। যেহেতু হৃদরোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল। এজন্য এ রোগ প্রতিরোধের দিকে জোর দিতে হবে। জীবনের জন্য সুস্থ হার্ট-সবসময় মনে রাখতে হবে। মানব দেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হার্ট। সুস্থ হার্ট মানেই সুস্থ মানুষ। সুতরাং হার্টকে সুস্থ রাখা একান্ত প্রয়োজন। সুস্থ হার্টের জন্য তিনটি বিষয় মেনে চলা জরুরী-
১. নিয়মিত ব্যায়াম
২. সুষম খাদ্য গ্রহণ
৩. মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা পরিহার এবং ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পরিত্যাগ

নিয়মিত ব্যায়ামসুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য। হার্টকে সবল রাখতে ব্যায়ামের বিকল্প নেই। ব্যায়াম করার জন্য সুপার এ্যাথলেট হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কেউ ব্যায়াম করতে পারে। ব্যায়ামকে আনন্দের বিষয় মনে করলে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়। এমন ব্যায়াম নির্বাচন করতে হবে যেটা করতে ভালো লাগে। গ্রুপ করেও ব্যায়াম করা যায়। যেমন-ফুটবল, বাস্কেট বল, ব্যাডমিন্টন প্রভৃতি খেলার মাধ্যমে আনন্দ যেমন পাওয়া যায় তদ্রুপ ব্যায়ামও হয়। যে কেউ যে কোনভাবে অনুশীলন করতে পারে। যেমন-হাঁটা, দৌড়ানো, দড়ি খেলা, নাচা, বাইসাইকেল চালনা, সাঁতার কাটাসহ অসংখ্য কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যায়াম হয়। শারীরিক পরিশ্রমও এক ধরনের ব্যায়াম। তাই হার্টকে সুস্থ রাখতে শারীরিক পরিশ্রম এবং নিয়মিত ব্যায়াম খুবই প্রয়োজন।
০ নিয়মিত হাঁটুন। প্রথমে হাঁটার পরিমাণ ১০-১৫ মিনিট করুন এবং ধীরে ধীরে ৩০ মিনিটে নিয়ে আসুন। সকালের নাস্তার পূর্বে এবং রাতের খাবারের পরে হাঁটা ভাল।
০ কাছের কোন দোকানে যেতে চাইলে রিকসা বা গাড়ির পরিবর্তে হাঁটুন অথবা সাইকেল ব্যবহার করুন।
০ লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করুন কিংবা কাঙ্খিত ফ্লোরের ২-৩ ফ্লোর আগেই নেমে বাকিটুকু সিঁড়ি দিয়ে নামুন।
০ গন্তব্য বাস স্টপেজের কিছুদূর আগেই নামুন এবং সেখান থেকে হেঁটে গন্তব্যস্থলে পৌছান।
০ নিয়মিত ব্যায়াম করুন। ক্যালেন্ডারে চিহ্ন দিয়ে রাখুন, কবে কখন ব্যায়াম করবেন।
০ যদি সিডিউল মিস হয়ে যায় তবে অন্যদিন তা করে নিন। ব্যায়াম সপ্তাহে ৩-৪ বার ৩০-৬০ মিনিট করার চেষ্টা করুন।
০ বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করুন। যেমন-একদিন হাঁটুন, অন্যদিন সাঁতার কাটুন, এর পরদিন সাইকেল চালান।
০ অনুশীলনের সময় এবং পরে পানি পান করুন।
০ মেডিটেশন করা হার্টের জন্য খুব ভালো। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে মেডিটেশন হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। কারণ মেডিটেশনের মাধ্যমে যে মানসিক চাপ মুক্ত হওয়া যায় তা শরীরের নিজস্ব পুনর্গঠন প্রণালী আর্টারীর দেয়ালের চর্বি কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।
০ ৪০ বছরের অধিক বয়সে হঠাৎ করে নতুন কোন ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। পূর্বের ব্যায়ামগুলো করাই ভাল।
০ ব্যায়াম করার সময় কোন রকম শারীরিক অসুস্থতা বোধ করলে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হবে এবং অনতিবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
০ নিয়মিত প্রার্থনা করুন, এতে মন ভাল থাকে।

সুষম খাদ্য গ্রহণবেঁচে থাকার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। সুস্থ হার্টের অধিকারী হওয়ার জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস একান- জরুরী। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং দারিদ্রতা বিভিন্ন রোগের কারণ। যেমন সুষম খাবার (Balanced Food) সম্পর্কে অনেকে জানে না। গরীবরা সুষম খাবারের অভাবে অনেক সময় অপুষ্টিতে ভোগে। অপরদিকে ধনীরা সুষম খাবারের কথা না জেনে ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার খেয়ে সঠিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ফাস্টফুড জাতীয় খাবার অত্যধিক পছন্দের। এছাড়া তারা কায়িক পরিশ্রম করতে চায় না। এই ফাস্টফুড খাওয়ার দরুন এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাবে নারী, শিশু, উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যেমন-ওবেসিটি বা শারীরিক স্থূলত্ব, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, দীর্ঘ মেয়াদী পেটের পীড়ার মত জটিল সমস্যা। অথচ আমাদের চারিদিকে নানান ধরনের শাক-সবজি রয়েছে। দেশীয় ফল যেমন-কলা, কামরাঙ্গা, আমলকী, আনারস, পেঁয়ারা, পেঁপে, বড়ই, আমড়া, জলপাই, কাঁঠাল, ডালিম, লেবু ইত্যাদি রয়েছে। যেগুলো যেমন সস্তা তেমন সহজলভ্য। এই সব ফল-মূল খাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ থাকা সম্ভব। সুষম খাদ্য গ্রহণ জীবনকে সুন্দর করে তোলে।

স্বাস্থ্যসম্মত খাবার:
০ প্রচুর পরিমাণে ফল-মূল, শাক-সবজি খান
০ অতিরিক্ত লবণ এবং চিনি গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। প্রতিদিন ৩ গ্রাম এর অধিক লবণ গ্রহণ করা উচিত নয়।
০ সকালে নাস্তা এবং দিনে তিন বার খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।
০ কড়া এবং অতিরিক্ত তেলে ভাজার পরিবর্তে ভাঁপ, সিদ্ধ, ঝলসানো, বেকিং করে রান্না করতে হবে অর্থাৎ রান্নার প্রণালীটি স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে।
০ মিষ্টি এবং গুরুপাক জাতীয় খাবার ক্রয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
০ প্রতিদিন অন্তত: ৬-৮ গ্লাস পানি পান করা উচিত।
০ খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের শস্য জাতীয় খাদ্য দ্রব্য রাখুন।
০ কম চর্বিযুক্ত এবং চর্বিবিহীন খাবার বেছে নিন।
০ উদ্ভিদ জাতীয় তেল যেমন-সানফ্লাওয়ার, কর্ণ অয়েল খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করুন।
০ মাছ, মুরগীর মাংস, সীম এবং ডাল জাতীয় যে কোন খাবার ও চর্বিবিহীন মাংস গ্রহণ করুন।
০ ডিমের কুসুম, চিংড়ী মাছ, গরু, খাসীর মাংস এবং মগজ পরিহার করুন।
০ খাবারের বিভিন্ন ক্ষতিকর কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।

মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা পরিহার এবং ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পরিত্যাগ হার্টের কাজ হলো পরিশুদ্ধ রক্ত সমস্ত দেহে সরবরাহ করা। যদি কেউ ধূমপায়ী হয়, এ্যালকোহল পান করে কিংবা নিষিদ্ধ ড্রাগ নেয় তাহলে তার হার্টের অতিরিক্ত পরিশ্রম হয়। অধিক পরিশ্রম করলে আমরা যেমন পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ি তদ্রুপ হার্টও ক্লান্ত হয়ে যায়। এরূপ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হার্ট রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদরোগে মৃত্যুর হার বহুগুণে বাড়ে। সুতরাং ধূমপান করা মোটেই উচিত নয়। কেউ ধূমপায়ী হলে এখনই ছেড়ে দিন। গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে যেসব ধূমপায়ী ১০ বছর যাবৎ ধূমপান সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেছেন তাদের হঠাৎ করে হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কমে গেছে। যে কোন ধরনের নেশা জাতীয় ড্রাগ হার্টের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই সকল নেশা জাতীয় দ্রব্য ত্যাগ করা উচিত। এমন কি ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোন ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়। উপরের নিয়মগুলো মেনে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং সুস্থির জীবন-যাপনের মাধ্যমে হৃদরোগ প্রতিরোধ অনেকটাই সম্ভব।

জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক
প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক,